শুল্ক বিবাদ নিরসনে দুদিন আলোচনার পরও সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছতে পারেননি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আলোচকরা। তবে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা আরো আলোচনার সুবিধার্থে বিদ্যমান শুল্কবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এজন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষের আলোচকরা। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ শুল্কবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবে তিনি অনুমোদন দিতে পারেন, না-ও পারেন। মার্কিন প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আলোচনার বিস্তারিত শোনার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। খবর দ্য গার্ডিয়ান ও সিএনএন।
চলতি সপ্তাহেই বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে একটি চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর পর থেকেই গোটা বিশ্বের নজর নিবদ্ধ ছিল চীন-মার্কিন আলোচনার দিকে। এ বিষয়ে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতি সমঝোতায় পৌঁছতে না পারলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষ করা। কিন্তু সেখানে অগ্রগতির কোনো লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
শুল্ক বিরতির মেয়াদ বাড়ানো না গেলে আগামী ১২ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আবারো পরস্পরের থেকে পণ্য আমদানির ওপর ১০০ শতাংশের চেয়ে বেশি হারে শুল্ক আরোপ করতে পারে। এ অতি উচ্চ শুল্কহার একসময় দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্য কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল, যার প্রভাব পড়েছিল সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে।
স্টকহোমে দুদিনের আলোচনার পর উভয় পক্ষের কর্মকর্তারা জানান, বিরোধপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমাধানে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। তবে ১২ আগস্ট শেষ হতে যাওয়া বিরতির মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন তারা। এ বিষয়ে চীনা পক্ষের শীর্ষ বাণিজ্য আলোচক ও দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী লি চেংগাং বলেছেন, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে চলমান থাকা শুল্কবিরতির মেয়াদ বাড়ানো গেলে তা আরো আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।
তবে এ নতুন বিরতি কতদিনের বা কবে শুরু হবে সে বিষয়ে মন্তব্য করেননি তিনি। অন্যদিকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এ বিরতির বিষয়ে একমত হলেও বলেছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প।’
আলোচনায় মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও উপস্থিত ছিলেন। তবে এ অচলাবস্থা ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনিও। যদিও পরে স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ‘আলোচনা অত্যন্ত গঠনমূলক ছিল। আমরা কেবল এখনো শুল্কবিরতির মেয়াদ বাড়ানোয় চূড়ান্ত অনুমোদন পাইনি।’
অন্যদিকে জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ‘শুল্ক বিবাদে বিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে আমরা ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলব। তিনি যদি চান, তাহলে এটিই কার্যকর হবে।’
এদিকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি স্কটের কাছ থেকে ফোন পেয়েছি। তিনি জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে খুব ভালো বৈঠক হয়েছে। মনে হচ্ছে, তারা আগামীকাল আমাকে এ বিষয়ে ব্রিফ করবেন। এবং আমি এটিতে (শুল্কবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধিতে) অনুমোদন করতে পারি, না-ও পারি।’
আর চীনা প্রতিনিধি লি চেংগাং নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভিকে বলেছেন, ‘উভয় পক্ষই শুল্কবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে কাজ চালিয়ে যাবে।’
তবে এ মন্তব্যে দ্বিমত পোষণ করে স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘চীনা উপমন্ত্রী যেটা বলেছেন, আমরা বিরতিতে সম্মত হয়েছি, এটি সঠিক নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা না বলা পর্যন্ত আমরা কিছুতেই সম্মত হইনি।’
চীন-মার্কিন সাম্প্রতিক বিরোধে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে রাশিয়া। চীনা কর্মকর্তাদের স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, রুশ জ্বালানি তেল নিষিদ্ধ করে দ্বিতীয় ধাপে শুল্ক আরোপের আইন করেছে মার্কিন কংগ্রেস। চীন যদি রুশ জ্বালানি তেল ক্রয় অব্যাহত রাখে, তাহলে দেশটির ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ হবে। কংগ্রেসে গৃহীত আইনের আওতায় ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে।
এর আগে সোমবার রাশিয়ার উদ্দেশে হুমকি ছোড়েন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই সময় তিনি বলেন, ‘রাশিয়া যদি ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি চুক্তি না করে, তবে যারা নিষিদ্ধ জ্বালানি তেল কিনছে সেসব দেশের ওপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে।’
সর্বশেষ বাণিজ্য আলোচনা বিষয়ে স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘চীন তাদের সার্বভৌমত্বকে খুব গুরুত্ব দেয়। আমরা তাতে হস্তক্ষেপ করতে চাই না।’
তিনি চীনকে জানিয়েছিলেন, দেশটির রাশিয়ার কাছে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ডুয়াল-ইউজ প্রযুক্তি বিক্রি এবং নিষিদ্ধ ইরানি জ্বালানি তেল কেনায় যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বিরোধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কারণ উভয় পক্ষ বরাবরই পরস্পরের প্রতি ছাড় না দেয়ার মনোভাব প্রকাশ করে এসেছে। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক আরোপের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং অতিপ্রয়োজনীয় দুষ্প্রাপ্য খনিজ উপাদান ও যন্ত্রাংশের রফতানি বন্ধ করে দিয়েছিল চীন।
মে মাসে জেনেভায় ৯০ দিনের শুল্ক বিরতি চুক্তি করে চীন-যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় মার্কিন পণ্যের ওপর আরোপকৃত শুল্ক ১২৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামাতে সম্মত হয় চীন। অন্যদিকে চীনা পণ্যের ওপর ১৪৫ থেকে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনে যুক্তরাষ্ট্র। জুনে আবার লন্ডনে আলোচনায় বসে দুই পক্ষ। ওই বৈঠকে চীনা দুষ্প্রাপ্য খনিজ চুম্বক সরবরাহ বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়েছিল উভয় পক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রও কিছু ছাড় দিয়েছিল সে সময়। যেমন এনভিডিয়ার চিপ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ওয়াশিংটন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের এসব বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের পরও ব্যাপক মাত্রায় অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাবেক মহাপরিচালক পাসকাল ল্যামি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিগুলো অসম্পূর্ণ। অনেক চুক্তিতে বিস্তারিত কিছু নেই। ফলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।